
শিক্ষক দিবস উদযাপনের চেয়ে শিক্ষক খেদানোর রমরমা টা এখন বেশি, কিরকম? রাষ্ট্র থেকে ছাত্র ছাত্রী,অভিভাবক, পাড়ার ঝান্ডা ধারি মোটা সোনার চেইন ঝোলানো মস্তান যে যখন পারছে খেদিয়ে দিচ্ছে।একজন সুস্থ নাগরিক হয়ে শিক্ষক এর আগে খেদানো শব্দ উচ্চারণ করতে হচ্ছে এটা আমার কাছে শুধু লজ্জার নয়,গোটা সমাজের কাছে লজ্জার । হ্যাপী টিচার্স ডে, সেলিব্রেশন নয়,বরং শ্রদ্ধায় নত হয়ে যেতে হয় এমন এক দিন, শিক্ষক কারা? শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এর বাইরে অসংখ্য মানুষ ,লঘু গুরু নির্বিশেষে ,এমনকি একটি ঘাস পোকা কিংবা মাকড়সা ও একটি শিক্ষক,এটা আরেকটু বৃহৎ প্রসঙ্গ, এটি তে তাই আমি যাচ্ছিনা,বুদ্ধিমান মানুষ নিশ্চই আমার বক্তব্য বুঝে গেছেন, নইলে বাকিরা আমাকে ভুল বুঝবেন, যাই হোক তবু পুরোটা পড়বেন। ফিরে আসি আজকের দিনের সাধারণ তাৎপর্য বর্তমানে কোথায়, দুর্নীতি গ্রস্থ শিক্ষক এর ভিড়,কে আসল কে নকল এর ভিড়, তিনু দাদা ঘাপটি মেরে শিক্ষকের মুখোশ পড়ে স্কুলের ভিতর দৌরাত্মের ভিড়, এসবের ঊর্ধ্বে প্রকৃত শিক্ষক দের অবস্থা কোথায়? তাদের জায়গা টা কোথায়? যে বাংলা মিডিয়াম এ পড়ে আমি বড় হয়েছি, সেই বাংলা মিডিয়াম কিভাবে কঙ্কাল সার হয়ে যাচ্ছে ,হয়ে গেছে,দেখে দুঃখ হয়, স্কুল বন্ধ হয়ে চলেছে অসংখ্য ( পরিসংখ্যান নিজে খুঁজে নেবেন) সুচারু পদ্ধতিতে বাংলা মিডিয়ামের কোমর ভেঙে দিয়ে ব্যবসার এক দারুন পথ ইংলিশ মিডিয়াম এর গজিয়ে ওঠা যত্র তত্র, আর বাবা মা এর সেকি অদ্ভুত আহ্লাদ, ছেলে কে "সাতটি তারার তিমির" বললে বোঝেনা অথচ সে ক্লাস নাইন অতিক্রম করেছে, সাত কে সেভেন বলতে হয়,তারা কে স্টার বলতে হয়, বাঙালি ধীরে ধীরে ব্রিটিশদের জোকার হয়ে যাচ্ছে,হাস্যকর একটা সব খুইয়ে ফেলা জাতি,তবু গর্বের অন্ত নেই। বাঙালি থেকে বাংলা চলে যাচ্ছে, অন্তঃসার শুন্য একটা প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, নকল একটা শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে কত কত ছেলে মেয়ে,আর শিক্ষা টা হয়ে গেছে পয়সাওয়ালা দের অধিকার। উচ্চ মার্গের ডোনেশন যারা দিতে পারছিনা,তাদের ছেলে মেয়েদের শিক্ষার জায়গা টা কোথায়? কি এক আলগা ছাত্রজীবন,কি এক অনিশ্চিত গন্তব্য,কি এক আদর্শহীন সময়, কেউ কবিতা পড়ছেনা,বই পড়ছেনা,এক পাতা টানা বাংলা রিডিং পড়তে না পারা প্রজন্ম,কপি পেস্ট কপি পেস্ট আর কপি পেস্টের শিক্ষা।এই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আস্থা হারিয়ে কত ছেলে মেয়ে অসময়ে টাকা রোজগারের দিকে ঝুঁকে পড়ছে , সেই সুযোগে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে ঝান্ডা ওয়ালা দের সমাবেশ এর দিকে যাওয়া ম্যাটাডোর ।মানবিকতা ,আদর্শ,নীতিবোধ যা কিছুই শিক্ষক দের থেকে আমরা পেয়ে এসেছি, আজ এই যে বোধ থেকে দু কলম লিখতে পারছি ,তাদের ছায়া পেলোনা এই ছেলেমেয়ে গুলো।ভীষন যত্ন নিয়ে বানানো হচ্ছে এদের,রাষ্ট্র বানাচ্ছে এদের , শিক্ষা কে মৃত না বানালে ধর্মের অন্ধকার বপন হবে কিভাবে! অনৈতিক কাজ এর হাতেখড়ি হবে কিভাবে! ঠিক ভুল এর কোনো তফাত থাকা যাবে না,যোগ্য অযোগ্য বলে কোনো বস্তু থাকবে না,জঙ্গলের রাজত্ব তৈরী করতে হবে, বিদ্বেষ,ক্ষোভ,হিংসে,দুর্নীতি,অপরাধ,সমস্ত কিছু ঠেসে ঢুকিয়ে দিতে হবে, তৈরি করতে হবে রাজনৈতিক দল এর বশীকরণ এর অজস্র ফলাফল, যাদের রাষ্ট্র যাই বোঝাবে তাই বুঝবে, যন্তর মন্তর ঘর অদৃশ্য হলেও গোটা দেশ ই এই ঘর,আমরা যারা বুঝছি তারা সংখ্যা লঘু, ধর্মীয় নেশা ,জাতপাত,রাজনীতি নিয়ে মত্ত হয়ে আছি।শিক্ষার প্রসার কোথায়,প্রান্তিক মানুষ এর শিক্ষা দূরের কথা,মফস্বলের ছেলে মেয়েরা শিক্ষার মৌলিক অধিকার পাচ্ছে? আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি রোজদিন।
প্রকৃত শিক্ষকদের যন্ত্রণা টের পাই,তারা সবটা দেখছেন,অস্বস্তিতে ভুগছেন,অনেকে মেনে নিয়েছেন , দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ করতে পারছেন না, এই রকম একটা বাল এর শিক্ষা ব্যবস্থায় দাড়িয়ে শিক্ষক দিবসে আমার মতন অছাত্র আর কি বা বলতে পারে, মেনে নাও বন্ধু, প্রণাম জানাই, আমার সেসব শিক্ষকদের ,যাদের নাম আমার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মাথায় থাকবে, প্রতিটা কবিতা গান লেখার আগে ,,প্রতিটা গম্ভীর ভাবনার আগে মনে হয় ভাবতে শেখানোর জন্য তো ওই শিক্ষকেরাই দায়ী,নইলে নিজেকেও হয়তো মেটেরিয়ালিস্টিক জীবনের পিছনে দৌড়ানো অবস্থায় খুঁজে পেতাম,কিংবা দিশাহীন নীতিহীন আদর্শহীন এক হালকা প্রজন্মের পোকা মাত্র তৈরি হতাম।
টেক্সট বুক এর বাইরে যেসকল শিক্ষক চিরকাল ছেলে মেয়েদের জীবন এর আদর্শ শিখিয়ে গেছেন,তাদের প্রতি আমার একটু অতিরিক্ত অগাধ শ্রদ্ধা বরাবর,ভালো থাকবেন প্রত্যেকে, মিস করি আপনাদের❤️
© অঞ্জন ঘোষ রায়